খালেদা জিয়াকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হবে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করলে: মির্জা ফখরুল

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনা জোরালো হয়েছে। তাঁর বর্তমান চিকিৎসা, বিদেশে পাঠানো, সরকারের সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে গত কয়েকদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এক অদ্ভুত টান টান উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, চিকিৎসকেরা যেদিন নিশ্চিত হবেন যে বেগম জিয়ার অবস্থা বিমানযাত্রার জন্য স্থিতিশীল, সেদিনই তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। 

এই ঘোষণা শুধু বিএনপি সমর্থকদেরই নয়, বরং পুরো দেশের রাজনৈতিক মহলকে নতুনভাবে আলোচনায় যুক্ত করেছে। একদিকে বিএনপি নেতৃত্ব বলছে, বেগম জিয়ার চিকিৎসা এখন সম্পূর্ণরূপে সময়সংবেদনশীল অন্যদিকে সরকার মনে করছে, চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিতে হবে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে তিনটি বিষয় বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা, বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। 

বেগম জিয়ার বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসকের ভূমিকা 

মির্জা ফখরুলের ভাষ্যমতে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা এখন সম্পূর্ণরূপে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একাধিকবার জানিয়েছেন যে তাঁর যকৃতজনিত জটিলতা, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অবস্থা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যেসব জটিল রোগে ভুগছেন, তার বেশিরভাগেরই উন্নততর চিকিৎসা দেশের বাইরে করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন এমনটাই দাবি করছে বিএনপি। 

বিএনপি মহাসচিব বলেন আমরা রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরর্ভ করছি না। চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া চেয়ারপারসনকে কোথাও নেওয়া হবে না। যেদিন তাঁরা তাঁ বলবেন যে তাঁরতাঁ শারীরিক অবস্থা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার মতো স্থিতিশীল, সেদিনই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

আরো পড়ুন: নৌকা মার্কা রয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালটে

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয় যে বিএনপি এখন চিকিৎসকদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ দেশের অভ্যন্তরে তাঁর চিকিৎসা পর্যাপ্তভাবে সম্ভব হচ্ছে কি না এ প্রশ্নে ক্রমেই বাড়ছে বিতর্ক। পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ, জাতীয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতি, রাজনৈতিক চাপ সবগুলো মিলিয়েই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। 

এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত, তবে চিকিৎসকের সংকেতের অপেক্ষা 

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, বেগম জিয়াকে বিদেশে নিতে হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের প্রয়োজন হবে। এতে অত্যাধুনিক লাইফ সাপোর্ট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, বিশেষ মনিটরিং সিস্টেম এবং যাত্রাপথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহযোগিতা থাকবে। তবে এতসব প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সত্ত্বেও মূল সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে চিকিৎসকদের উপর।

ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও জানান, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে চিকিৎসকের অনুমতি মিললেই দ্রুত দেশের বাইরে নেওয়া যায়। কারণ রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ায় সময় অপচয় তাঁরা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।


তবে বাস্তবতা হচ্ছে রোগীর শরীর যদি বিমানযাত্রা সহ্য করার অবস্থায় না থাকে, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর হবে না। তাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসকের সবুজ সংকেতকে।

সরকারি সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টি শুধুমাত্র চিকিৎসাবিষয়ক সিদ্ধান্ত নয় এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। সরকার মনে করছে, আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো বিশেষ আইনি ব্যবস্থার বিষয়। ফলে সরকারের অনুমতি ছাড়া এ সিদ্ধান্ত এগোনো যাবে না।

অন্যদিকে বিএনপি বলছে, মানবিক কারণে এবং দেশের অভ্যন্তরে উন্নত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁকে দ্রুত বিদেশে নেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মহলও মানবিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে বলে বিএনপির দাবি।

ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকলেও, বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতিএই বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই উত্তপ্ত। বিরোধী দলের আন্দোলন, সরকারের অবস্থান, জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপট সব মিলিয়ে এই চিকিৎসা বিষয়টি রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে উদ্বেগের ছাপ

মির্জা ফখরুলের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিএনপি নেতারা একধরনের গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তিনি আরও বলেন চেয়ারপারসনের জীবন এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়ের হিসেবের ওপর নির্ভরর্ভ শীল। আমরা শুধুএকটি মানবিক সিদ্ধান্ত চাই, যাতে তাঁরতাঁ পরিবার ও দলের কর্মীরা কিছুটা স্বস্তি পায়। 

তাঁর মতে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি কোনো দলের ব্যক্তিগত দাবির জায়গা নয় এটি একজন নাগরিকের জীবনরক্ষার মানবিক আবেদন।

বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, দেশের বৃহৎ অংশের জনগণও এখন মনে করছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। যদিও সরকার বলছে, আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়।

আইন অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার সাজার কার্যকারিতা স্থগিত করে তাঁকে দেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনুমতির প্রয়োজন, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান একই রয়েছে আইন ও বিধিমালা অনুসারেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
চিকিৎসকরা তবে বারবার বলছেন, তাঁর বহুমুখী জটিল রোগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চিকিৎসা জরুরি।


এর মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে অনেকে বলছে এটি মানবিক ইস্যু, আবার কেউ মনে করছে, বিদেশে গেলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

জনমতের চাপও বাড়ছে

সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, বেগম জিয়া দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাই তাঁর চিকিৎসা নিয়ে মানবিক বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। আবার অনেকে মনে করছেন, আইন সবার জন্য সমান এখানে ব্যতিক্রমী চিকিৎসা অনুমতির ক্ষেত্রে পূর্বের নজির বিবেচনা করতে হবে।

এইসব মতামত একদিকে সমাজের বিভাজনকে সামনে আনে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝায়।

ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে পরিষ্কার বিএনপি এখন আর কোনো রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তাঁরা চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।

এ থেকে অনুমান করা যায়, খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁর শারীরিক অবস্থার সামান্য পরিবর্তনেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা যখনই বলবেন, তখনই তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বিদেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সবশেষে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত, সরকারের অনুমতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সবকিছু মিলিয়েই বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

একজন মানুষের জীবন রক্ষার প্রয়োজনে দ্রুততম সময়ে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়া।রাজনীতি, আইন, প্রশাসন সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এখন দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যা প্রয়োজন, তা যেন সময়মতো করা হয়।কারণ জীবনের মূল্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের চেয়ে সবসময় বড়, সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *